পাহাড়ের প্রতি যাদের এক অদ্ভুত টান, তাদের কাছে নেপাল মানে কেবল একটি মানচিত্র নয়, বরং এক আদিম রোমাঞ্চের নাম। হিমালয়ের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকা মেঘের ভেলা আর মোমোর সুগন্ধে ঘেরা কাঠমান্ডুর গলি, সব মিলিয়ে নেপাল মানেই এক নেশা। কিন্তু পাহাড় কন্যা নেপালের এই রূপ সরাসরি দেখার জন্য চাই সঠিক পরিকল্পনা আর প্রস্তুতি। ব্যাগ গোছানো থেকে শুরু করে হিমালয়ের ট্রেইলে পা রাখা পর্যন্ত সবকিছু নিয়ে আজকের এই বিশেষ আয়োজন
নেপাল কেন যাবেন?
-
বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ: এখানে দেখতে পাবেন মাউন্ট এভারেস্ট, অন্নপূর্ণা, লোৎসে, মাকালু এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো ১৪টি আট-হাজারী পর্বতের মধ্যে আটটি।
-
ট্র্যাকিং স্বর্গ: বিখ্যাত এভারেস্ট বেস ক্যাম্প (EBC), অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প (ABC) এবং অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্র্যাকিং রুটের মতো বিশ্বমানের অ্যাডভেঞ্চারের সুযোগ।
-
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য: কাঠমান্ডু উপত্যকার প্রাচীন মন্দির, ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এবং নেওয়ারি স্থাপত্য আপনাকে মুগ্ধ করবে।
-
শান্তির বার্তা: গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনী, যা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে এক পবিত্র স্থান।
নেপাল কেবল একটি দেশ নয়, এটি একটি অভিজ্ঞতা। পাহাড়ের বিশালতা, মানুষের সরলতা এবং প্রকৃতির নৈসর্গিক রূপ আপনাকে বারবার টেনে নিয়ে যাবে এই ‘পাহাড় কন্যা’র কাছে।
নেপালের প্রধান পর্যটন কেন্দ্রগুলো
নেপালের পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে মূলত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়: সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, প্রাকৃতিক ও অ্যাডভেঞ্চার হাব, এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র।
১. সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র
নেপালের সংস্কৃতি হাজার বছরের পুরোনো এবং এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো কাঠমান্ডু উপত্যকার প্রাচীন স্থাপত্য ও ধর্মীয় স্থানগুলো।
ক) কাঠমান্ডু উপত্যকা (Kathmandu Valley)
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু হলো সংস্কৃতি ও ইতিহাসের কেন্দ্রস্থল। এটি নিজেই ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে তালিকাভুক্ত।
-
কাঠমান্ডু দরবার স্কোয়ার (Kathmandu Durbar Square): এটি একসময় মল্ল ও শাহ রাজবংশের রাজকীয় বাসভবন ছিল। এখানে প্রাচীন মন্দির, প্রাসাদ এবং জীবন্ত দেবী কুমারীর (Living Goddess Kumari) মন্দির দেখা যায়।
-
স্বয়ম্ভুনাথ (Swayambhunath Stupa – মাংকি টেম্পল): একটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত প্রাচীন বৌদ্ধ স্তূপ। এর চূড়ায় আঁকা বুদ্ধের চোখ শহরের দিকে তাকিয়ে আছে।
-
বৌদ্ধনাথ (Boudhanath Stupa): বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গোলাকার স্তূপ এবং নেপালে তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মের কেন্দ্র।
-
পশুপতিনাথ মন্দির (Pashupatinath Temple): এটি বিশ্বের সবচেয়ে পবিত্র শিব মন্দির এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান।
খ) ভক্তপুর ও পাটন (Bhaktapur & Patan/Lalitpur)
কাঠমান্ডু উপত্যকার এই দুটি শহর প্রাচীন নেওয়ারি শিল্পকলা ও স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত।
-
ভক্তপুর দরবার স্কোয়ার: এখানে ৫ তলা টাউলে (Nyatapola) মন্দির, ৫০টি জানালা বিশিষ্ট প্রাসাদ এবং চমৎকার কাঠের খোদাই দেখতে পাবেন। ভক্তপুরকে ‘জীবন্ত জাদুঘর’ বলা হয়।
-
পাটন দরবার স্কোয়ার: এখানকার মন্দির ও চত্বরগুলো তার ধাতব শিল্প ও কারুকার্যের জন্য সুপরিচিত।
গ) লুম্বিনী (Lumbini)
গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান হিসেবে লুম্বিনী বিশ্বজুড়ে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্রতম স্থান।
-
মায়া দেবী মন্দির (Maya Devi Temple): বিশ্বাস করা হয় যে এই স্থানটিতেই বুদ্ধের জন্ম হয়েছিল।
-
অশোক স্তম্ভ (Ashoka Pillar): সম্রাট অশোক খ্রিস্টপূর্ব ২৪৯ সালে এই স্তম্ভটি স্থাপন করেন।
-
বিভিন্ন দেশের তৈরি মঠ ও প্যাগোডা, যা লুম্বিনীকে আন্তর্জাতিক তীর্থকেন্দ্রে পরিণত করেছে।
২. প্রাকৃতিক ও অ্যাডভেঞ্চার হাব
পাহাড় ও হ্রদের জন্য বিখ্যাত নেপালের এই অঞ্চলগুলো অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের প্রধান গন্তব্য।
ক) পোখরা (Pokhara)
নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শহরটি ‘হিমালয়ের প্রবেশদ্বার’ এবং অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের কেন্দ্র।
-
ফেওয়া লেক (Phewa Lake): এর শান্ত জলে অন্নপূর্ণা পর্বতমালার তুষারাবৃত চূড়ার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। লেকের মাঝে অবস্থিত বরাহী মন্দিরও জনপ্রিয়।
-
সারাংকোট (Sarangkot): সূর্যোদয়ের সময় হিমালয় পর্বতমালার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করার জন্য বিখ্যাত। প্যারাগ্লাইডিংয়ের জন্য এটি সেরা স্থান।
-
ডেভিস ফলস (Devi’s Falls): একটি রহস্যময় জলপ্রপাত যেখানে জল ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।
-
ওয়ার্ল্ড পিস প্যাগোডা (World Peace Pagoda): ফেওয়া লেকের উপর একটি পাহাড়ে অবস্থিত সাদা স্তূপ, যা থেকে পোখরা শহর ও অন্নপূর্ণা রেঞ্জের দৃশ্য চমৎকার।
খ) নাগরকোট (Nagarkot)
কাঠমান্ডু থেকে অল্প দূরে অবস্থিত এই হিল স্টেশনটি ২,১৭৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এবং এখান থেকে মাউন্ট এভারেস্টসহ হিমালয়ের অনেকগুলো শৃঙ্গের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখা যায়।
গ) ট্রেকিং রুট (Trekking Routes)
নেপালের বিশ্বখ্যাত ট্রেকিং রুটগুলোই বহু পর্যটককে আকর্ষণ করে:
-
এভারেস্ট বেস ক্যাম্প (EBC) ট্রেক: বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের পাদদেশ পর্যন্ত পৌঁছানোর চ্যালেঞ্জিং ও কিংবদন্তী রুট।
-
অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্প (ABC) ট্রেক: তুলনামূলকভাবে সহজ ও কম সময়ে সম্পন্ন করা যায়, যেখানে অন্নপূর্ণা রেঞ্জের কাছাকাছি যাওয়া যায়।
-
অন্নপূর্ণা সার্কিট (Annapurna Circuit): সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ট্রেকিং রুটগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা উচ্চ পর্বত গিরিপথ, গ্রাম ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে যায়।
-
পুন হিল (Poon Hill) ট্রেক: মাত্র কয়েক দিনের সহজ ট্রেক, যা থেকে অন্নপূর্ণার শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্য দেখা যায়।
৩. 🐅 বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র
বন্যপ্রাণী ও ইকো-ট্যুরিজম প্রেমীদের জন্য এই অঞ্চলগুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
ক) চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্ক (Chitwan National Park)
ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকায় স্থান পাওয়া এই উদ্যানটি নেপালের দক্ষিণে তেরাই সমভূমিতে অবস্থিত।
-
আকর্ষণ: এক শিংযুক্ত গন্ডার, বেঙ্গল টাইগার, কুমির এবং অসংখ্য প্রজাতির পাখি দেখা যায়।
-
কার্যক্রম: জঙ্গল সাফারি (জিপ বা হাতির পিঠে), ক্যানোয়িং, থারু গ্রামের সংস্কৃতি উপভোগ।
খ) সাগরমাথা ন্যাশনাল পার্ক (Sagarmatha National Park)
মাউন্ট এভারেস্ট এবং আশেপাশের অন্যান্য পর্বতশৃঙ্গ এই পার্কের অন্তর্ভুক্ত। এটি একটি সংরক্ষিত এলাকা, যেখানে ট্রেকিংয়ের সময় স্থানীয় শেরপা সংস্কৃতি এবং বিরল গাছপালা ও প্রাণী দেখা যায়।
নেপালের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
নেপালের সংস্কৃতি মূলত হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের গভীর প্রভাব এবং নেওয়ারি, শেরপা, মৈথিলীসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও রীতিনীতির সমন্বয়ে গঠিত।
১. স্থাপত্য ও শিল্পকলা: কাঠমান্ডু উপত্যকার সম্পদ
নেপালের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূল আকর্ষণ হলো কাঠমান্ডু উপত্যকা (Kathmandu Valley), যা নিজেই ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত। এখানকার স্থাপত্যশৈলীটি মূলত নেওয়ারি স্থাপত্য নামে পরিচিত, যা কাঠ ও ধাতুর সূক্ষ্ম কারুকার্যের জন্য বিখ্যাত।
| ঐতিহ্যবাহী স্থান | বৈশিষ্ট্য | সাংস্কৃতিক গুরুত্ব |
| দরবার স্কোয়ার (কাঠমান্ডু, পাটন, ভক্তপুর) | কাঠ, ইট ও ধাতুর সূক্ষ্ম খোদাই করা প্রাচীন রাজপ্রাসাদ, মন্দির ও চত্বর। মল্ল ও শাহ রাজাদের রাজকীয় ঐতিহ্য বহন করে। | এই চত্বরগুলি উৎসব, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও জনজীবনের কেন্দ্র। জীবন্ত দেবী কুমারী (Living Goddess Kumari) প্রথা এখানে বিদ্যমান। |
| পশুপতিনাথ মন্দির | বিশ্বের বৃহত্তম শিবলিঙ্গ সমেত একটি পবিত্র হিন্দু মন্দির। প্যাগোডা শৈলীর এই মন্দিরটি বাগমতী নদীর তীরে অবস্থিত। | এটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে ভারতের বারাণসীর মতোই পবিত্র এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। |
| বৌদ্ধনাথ স্তূপ | এশিয়ার বৃহত্তম গোলাকার বৌদ্ধ স্তূপগুলির মধ্যে অন্যতম। এর বিশাল মন্ডল (Mandala) তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্মের কেন্দ্রবিন্দু। | এটি নেপালের তিব্বতীয় বৌদ্ধদের একটি প্রধান তীর্থস্থান। স্তূপের শীর্ষে আঁকা বুদ্ধের চোখ সর্বজ্ঞতার প্রতীক। |
| স্বয়ম্ভুনাথ স্তূপ (মাংকি টেম্পল) | উপত্যকার উপর একটি পাহাড়ে অবস্থিত প্রাচীনতম বৌদ্ধ তীর্থস্থান। | এটি হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয়ের জন্যই পবিত্র এবং ধর্মীয় সহাবস্থানের উদাহরণ। |
২. ধর্মীয় সহাবস্থান ও রীতিনীতি
নেপালের সংস্কৃতিতে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্ম এমনভাবে মিশে আছে যে অনেক দেব-দেবী ও উৎসব উভয় সম্প্রদায় দ্বারা সমানভাবে পালিত হয়।
-
সহাবস্থান: প্রায়শই দেখা যায়, হিন্দুরা বৌদ্ধ মন্দিরে এবং বৌদ্ধরা হিন্দু মন্দিরে উপাসনা করছেন। উদাহরণস্বরূপ, পশুপতিনাথ মন্দিরের কাছেই বৌদ্ধনাথ স্তূপ অবস্থিত।
-
জীবন্ত দেবী কুমারী (Kumari): নেপালের একটি প্রাচীন ও অনন্য প্রথা। একজন কম বয়সী মেয়েকে দেবী দুর্গার অবতার রূপে পূজা করা হয়। বয়ঃসন্ধি না আসা পর্যন্ত সে একটি রাজকীয় প্রাসাদে অবস্থান করে এবং উৎসবের সময় তাকে নিয়ে শোভাযাত্রা করা হয়।
-
উৎসব:
-
দশাইন (Dashain): নেপালের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান উৎসব। এটি দেবী দুর্গার বিজয়ের প্রতীক, যা পরিবারের মিলন ও নতুন শুরুর বার্তা দেয়।
-
তিহার বা দীপাবলি (Tihar): আলোর উৎসব, যা দীপাবলির অনুরূপ। এই উৎসবে কুকুর, গরু এবং কাককে তাদের বিশ্বস্ততার জন্য পূজা করা হয়।
-
বুদ্ধ জয়ন্তী: গৌতম বুদ্ধের জন্ম, জ্ঞানপ্রাপ্তি ও মহাপরিনির্বাণ এই দিনেই পালিত হয়।
-
৩. জাতিগোষ্ঠী ও লোকসংস্কৃতি
নেপালে প্রায় ১২৫টিরও বেশি জাতিগোষ্ঠী এবং ১২৩টি ভাষা প্রচলিত। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব জীবনধারা, পোশাক, লোকনৃত্য এবং সঙ্গীত রয়েছে।
-
নেওয়ার (Newar): কাঠমান্ডু উপত্যকার আদি বাসিন্দা। তারা স্থাপত্য, শিল্পকলা এবং জাত্রা (ধর্মীয় শোভাযাত্রা) উৎসব পালনে অগ্রণী। নেওয়ারি রন্ধনপ্রণালীও বিখ্যাত।
-
শেরপা (Sherpa): হিমালয় অঞ্চলে এদের বসবাস। পর্বত আরোহণে তাদের দক্ষতা বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। তাদের সংস্কৃতি মূলত তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত।
-
গুরুং ও মাগার (Gurung & Magar): এই গোষ্ঠীর অনেকেই ব্রিটিশ ও ভারতীয় সেনাবাহিনীতে গোর্খা সৈন্য হিসেবে কাজ করে থাকেন। তাদের নিজস্ব ভাষা ও লোকনৃত্য (যেমন, ঘান্তু নৃত্য) রয়েছে।
-
থারু (Tharu): দক্ষিণ নেপালের তেরাই অঞ্চলের আদিবাসী। চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্কের আশেপাশে এদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়।
নেপালের এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং তার সুরক্ষার জন্যই নেপালকে ‘পাহাড় কন্যা’র পাশাপাশি ‘জীবন্ত সাংস্কৃতিক জাদুঘর’ নামেও অভিহিত করা হয়।
নেপাল ভ্রমণ গাইড: প্রস্তুতি থেকে অভিজ্ঞতায়
১. নেপাল ভ্রমণের সেরা সময় (Best Time to Visit)
নেপাল ভ্রমণের জন্য আবহাওয়া সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।
-
সেরা সময় (অক্টোবর – নভেম্বর): এটি নেপালের পর্যটন মৌসুমের ‘সুপার টাইম’। আকাশ একদম পরিষ্কার থাকে, হিমালয়ের দৃশ্য সবচেয়ে ভালো দেখা যায় এবং ট্রেকিংয়ের জন্য আদর্শ আবহাওয়া।
-
দ্বিতীয় সেরা সময় (মার্চ – মে): বসন্তকাল। পাহাড়ে রডোডেনড্রন ফুল ফোটে এবং আবহাওয়া বেশ মনোরম থাকে।
-
এড়িয়ে চলাই ভালো (জুন – আগস্ট): বর্ষাকাল। এসময় মেঘের কারণে পাহাড় দেখা যায় না এবং ট্রেকিং রুটে জোঁকের উপদ্রব ও ভূমিধসের ঝুঁকি থাকে।
২. কী কী খাবার অবশ্যই ট্রাই করবেন (Must-Try Foods)
নেপালি খাবার শুধু সুস্বাদু নয়, বরং বেশ স্বাস্থ্যকরও বটে।
-
ডাল-ভাট (Dal Bhat): নেপালের জাতীয় খাবার। ভাত, ডাল, সবজি, আচার এবং মাংসের সমন্বয়ে এটি ট্রেকারদের শক্তির প্রধান উৎস। (কথায় আছে: Dal Bhat Power, 24 Hour!)
-
মোমো (Momo): নেপালের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্ন্যাকস। বাফ (Buff), চিকেন বা ভেজ মোমো ঝাল চাটনি দিয়ে ট্রাই করতে ভুলবেন না।
-
নিউয়ারি খাদা (Newari Khaja): কাঠমান্ডু উপত্যকার ঐতিহ্যবাহী খাবার। এতে চিঁড়া, ছোলা, মাংস (চোইলা) এবং ডিম থাকে।
-
সেল রুটি (Sel Roti): চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি এক ধরণের মিষ্টি রিং-আকৃতির রুটি, যা অনেকটা ডোনাটের মতো।
-
থুকপা (Thukpa): তিব্বতীয় ঘরানার গরম নুডলস স্যুপ, যা ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় খুব আরামদায়ক।
-
জুজু ধাউ (Juju Dhau): ভক্তপুরের বিখ্যাত ‘কিং দই’। এটি মাটির পাত্রে জমানো খুব ঘন ও মিষ্টি দই।
৩. ব্যাগে যা যা রাখা জরুরি (Packing Essentials)
নেপালের আবহাওয়া ক্ষণে ক্ষণে বদলায়, তাই ব্যাগে নিচের জিনিসগুলো অবশ্যই রাখবেন:
-
পোশাক: লেয়ারিং (Layering) পদ্ধতি অনুসরণ করুন। থার্মাল ইনার, ফ্লিস জ্যাকেট, এবং একটি ভালো উইন্ডপ্রুফ বা ডাউন জ্যাকেট। এক জোড়া ভালো গ্রিপের হাইকিং জুতো।
-
ব্যক্তিগত যত্ন: সানস্ক্রিন, লিপবাম এবং ময়েশ্চারাইজার (পাহাড়ি বাতাস খুব শুষ্ক থাকে)।
-
ফার্স্ট এইড কিট: সাধারণ ওষুধের পাশাপাশি উচ্চতাজনিত সমস্যার জন্য ডায়ামক্স (Diamox), ওআরএস, পেইন কিলার এবং ব্যান্ডেজ।
-
ইলেক্ট্রনিক্স: পাওয়ার ব্যাংক, ইউনিভার্সাল অ্যাডাপ্টার এবং মেমোরি কার্ড।
-
অন্যান্য: রেইনকোট বা ছাতা, ফ্ল্যাশলাইট বা হেডল্যাম্প এবং জল বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট।
৪. নিজেকে যেভাবে প্রস্তুত করবেন (Preparation Tips)
-
শারীরিক ফিটনেস: আপনি যদি ট্রেকিং করতে চান, তবে অন্তত ১ মাস আগে থেকে নিয়মিত হাঁটা, সিঁড়ি দিয়ে ওঠা এবং কার্ডিও ব্যায়াম শুরু করুন।
-
ভিসা ও নথি: বাংলাদেশিদের জন্য নেপালে অন-অ্যারাইভাল ভিসা পাওয়া যায়। পাসপোর্টের অন্তত ৬ মাস মেয়াদ থাকতে হবে। পারমিটের জন্য বেশ কয়েক কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি সাথে রাখুন।
-
ভিসা সংক্রান্ত যে কোন তথ্যের জন্য নেপাল ভ্রমণ: বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসা নির্দেশিকা পড়ে দেখতে পারেন।
-
মুদ্রা: নেপালি রুপি (NPR) সাথে রাখা ভালো। কাঠমান্ডু বা পোখরায় অনেক মানি এক্সচেঞ্জ আছে। বড় নোটের ইন্ডিয়ান রুপি (৫০০/২০০০) সেখানে অনেক সময় চলে না।
-
সিম কার্ড: বিমানবন্দরেই Ncell বা Nepal Telecom-এর সিম কার্ড সংগ্রহ করে নিন। ডাটা প্যাক থাকলে ম্যাপ দেখতে সুবিধা হবে।
ছোট্ট টিপস: নেপালে মানুষের সাথে কথা বলার সময় ‘नमस्ते’ (নমস্তে) বলে সম্বোধন করুন। এটি তাদের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানোর একটি চমৎকার উপায়।
নেপাল, বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখরের পাদদেশে শান্তির এক নীড়। মন্দির থেকে পাহাড়ের ট্রেইল, আর স্তূপের শান্ত চোখ থেকে পোখরার নীল জল, নেপাল আপনাকে প্রতি মুহূর্তে নতুন করে চেনাবে নিজেকে। আপনি কি প্রস্তুত মেঘের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা এই বিস্ময়কন্যাকে আপন করে নিতে?