01748878526 01707500505
01748878526 01707500505

পহেলা বৈশাখ : বাংলার প্রাণের উৎসব

পহেলা বৈশাখ: কিছু স্থিরচিত্র

পহেলা বৈশাখ | Pohela Boishakh
পহেলা বৈশাখ | Pohela Boishakh
পহেলা বৈশাখ | Pohela Boishakh
পহেলা বৈশাখ | Pohela Boishakh
পহেলা বৈশাখ | Pohela Boishakh
পহেলা বৈশাখ | Pohela Boishakh
পহেলা বৈশাখ | Pohela Boishakh
পহেলা বৈশাখ | Pohela Boishakh
পহেলা বৈশাখ | Pohela Boishakh

এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ
তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক
যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি,
অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক।
মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা
রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি,
আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ
মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক।

ভোরের সূর্যের উদিত হওয়ার প্রারম্ভে সম্মিলত কন্ঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে শুরু হয় বাঙালীর বর্ষবরণ বা পহেলা বৈশাখ (pohela boishakh)। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলত কন্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহবান জানান।

স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃত পক্ষে যে গাছের ছায়ায় মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়, অশ্বত্থ গাছ । ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠির নিপীড়ন ও সাংস্কৃতিক সন্ত্রাসের প্রতিবাদে ১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা।

ইতিহাস

বাংলা, হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক কিন্তু এক সময় বাঙলায় কোন নিজস্ব বর্ষপঞ্জি ছিল না। মূলত অনুসরণ করা হত মগী সনকে। এই বাংলায় মোগল আমলে সম্রাট আকবর নতুন বর্ষপঞ্জি চালু করলেন। পহেলা বৈশাখ (pohela boishakh) বাংলা বর্ষের প্রথম দিন সেই থেকে বাঙ্গালি বাংলা নববর্ষ পালন করে আসছে।

হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারটি মাস অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। সৌর পঞ্জিকার শুরু হত গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়ু এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হত। তখন বাংলা শুভ নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হত। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। প্রযুক্তি প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়ায় কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হত।
ভারতবর্ষে মুঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর মুঘল সম্রাটেরা কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতো হিজরী সন অনুসারে। হিজরী সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল, ঋতুর সাথে নয়।  কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতে হতো। এতে কৃষকরা খাজনা দিতে অপরারগ হয়ে পড়তো। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন।

সম্রাটের আদেশে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই পদ্ধতি কার্যকর করা হয় সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে (pohela boishakh) ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন এবং নানা পিঠা দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন উৎসবের ও মেলার আয়োজন করা হতো। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়, যার রুপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে।

তখনকার সময় এই দিনের প্রধান কাজ ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা হলো মূলত একটি নতুন হিসাব বই। প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হল বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাঠের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সকল স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকনদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন ও নিমকি আপ্যায়ন করে থাকে। হালখাতার প্রথাটি এখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে, বিশেষত স্বর্ণের দোকানে।

কিন্ত মোগলদের পতনের পর ইংরেজরা ক্ষমতায় আসলে এই ব্যবস্থার বিলুপ্ত করা হয়। ফলে ইংরেজদের আমলে আর পহেলা বৈশাখ এবং উৎসব সম্বন্ধে আর কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তার দীর্ঘকাল পর ১৯১৭ সালে ১ম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের জয় কামনায় পহেলা বৈশাখে কীর্তন ও পূজার আয়োজন করা হয়। এরপর আবার ১৯৩৮ সালে অনুরূপভাবে উদযাপনের প্রমাণ পাওয়া যায়। সর্বশেষ ১৯৬৭ সালে তা মুল আলোচনায় আসে এ সময় পাকিস্তান সরকার বাঙ্গালী সংস্কৃতির উপর বিভিন্নভাবে আঘাত হানে, এর অংশ হিসেবে রবীন্দ্র সঙ্গীত নিষিদ্ধ করে। তার প্রতিবাদে ছায়ানট রমনার বটমূলে রবীন্দ্র সঙ্গীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করে যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

বাংলা একাডেমী ১৯৮৮ সালে ১৪ই এপ্রিলকে পহেলা বৈশাখ হিসেবে নির্ধারণ করে বাংলা পঞ্জিকা বের করে। তারপর ১৯৮৯ সালে সর্বপ্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে অসাম্প্রদায়িক বাঙ্গালীর চেতনার প্রতীক হিসেবে মঙ্গল শোভাযাত্রার (Mangal Shobhajatra) আয়োজন করে।

সূর্যোদয়ের সাথে বাংলা বছর শুরু

খ্রিস্টাব্দ বা ইংরেজি সালের তারিখ গণনা রাত ১২টার পর শুরু হয়। এর পেছনে কারণ হলো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। একটি চক্র শুরু হয়ে শেষ হলেই দিন শেষ হয় অর্থাৎ ঘড়ির কাঁটাই এখানে মূল ভিত্তি। তাই প্রতিবছর ইংরেজি নতুন বছর শুরু হয় ঘড়ির কাঁটা ঠিক রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে।

হিজরি সালের তারিখ গণনা করা হয় সূর্যাস্তের পর থেকে। কারণ হিজরীর দিন হিসেব করা হয় চাঁদ দেখার উপর ভিত্তি করে। তাই চাঁদ উঠলেই সন্ধ্যা থেকে হিজরি নতুন দিন শুরু।

আর বাংলা নববর্ষে নতুন বছরের দিন শুরু হয় সকালে সূর্যোদয়ের পর থেকে। এর প্রধান কারণ হল কৃষিকাজ। কারণ সম্রাট আকবর বাংলা সালকে ফসল তোলার উপর ভিত্তি করে খুব সুন্দর করে বিন্যাস করেছিলেন। তখন সূর্য ওঠার পর কৃষিকাজ শুরু হত এবং তার ভিত্তিতেই দিন গোণাও শুরু হত। ইংরেজি নতুন বছরের মত রাতে কোনও উৎসবের আয়োজন করা হতো না। ফলে সূর্যোদয়ের পর সকাল থেকেই শুরু হতো বাংলা নববর্ষের আচার-অনুষ্ঠান।

উৎসব

নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্টীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় সম্পর্ক। গ্রামে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে উঠে, নতুন জামাকাপড় পড়ে এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যায়। বাড়িঘর পরিষ্কার করা হয় এবং সাধ্যমত সুন্দর করে সাজানো হয়। খাবারের বিশেষ ব্যবস্থাও করে।  গ্রামের কোন খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার (boishakhi mela)। মেলাতে থাকে নানা রকম কুঠির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন, থাকে নানারকম পিঠা পুলির আয়োজন। দিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া তথা নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা কিংবা কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন। বাংলাদেশে কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি হয় ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রাম-এর লালদিঘী ময়দানে, যা জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিত।

মঙ্গল শোভাযাত্রা (Mangal Shobhajatra)

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পহেলা বৈশাখ (pohela boishakh) বা বৈশাখী উৎসবের একটি আবশ্যিক ব্যাপার হলো মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখে সকালে শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে চারুকলা ইনস্টিটিউটে এসে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবণ এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয় বিভিন্ন রং-বেরঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি দিয়ে। ।

সকল শ্রেণী-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে শোভাযাত্রার মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার জন্য।  ১৯৮৯ সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা (Mangal Shobhajatra) পহেলা বৈশাখের উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষনে পরিনত হয়ছে, যা ক্রমে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ২০১৫ সালে এই মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ইউনেস্কো (UNESCO) বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অধরা বা ইনট্যানজিবল (Intangible) সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

বউমেলা

ঈশা খাঁর সোনারগাঁয় ব্যতিক্রমী এক মেলা বসে, যার নাম ‘বউমেলা’। প্রায় দুইশ বছরের পুরানো একটি বটবৃক্ষকে কেন্দ্র করে যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে এ বউ মেলা। বৈশাখের ২য় দিন থেকে এ ‘বউমেলা’ শুরু হয় সোনারগাঁও উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন জয়রামপুর এলাকায় ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে।

গ্রামের মানুষের ধারণা, প্রায় ২০০ বছর ধরে পয়লা বৈশাখে শুরু হওয়া এই মেলা চলে পাঁচ দিনব্যাপী। প্রাচীন একটি বটবৃক্ষের নিচে এই মেলা বসে, যদিও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সিদ্ধেশ্বরী দেবীর পুজো হিসেবে এখানে সমবেত হয়। বিশেষ করে কুমারী, নববধূ, এমনকি জননীরা পর্যন্ত তাঁদের মনোবাসনা পূরণের আশায় রেকাবি ভরা বৈশাখী ফলের ভোগ নিয়ে দলে দলে হিন্দু নারীরা হাজির হয় বউ মেলায়। এই মেলায় এসে পূজা-অর্চনা করেন।

সন্দেশ-মিষ্টি-ধান দূর্বার সঙ্গে মৌসুমি ফলমূল নিবেদন করে ভক্তরা। পাশাপাশি দেবতার সন্তুষ্টির জন্য কবুতর উড়ানো ও পাঁঠা বলি দেয়া হয় বৃক্ষ দেবতার পদতলে। স্বামী সংসারের বাঁধন যেন অটুট থাকে সারা বছর সুখ শান্তিতে যেন কাটে দাম্পত্য জীবন এই কামনাতেই পূজার আয়োজন করে হিন্দু নারীরা।

ঘোড়ামেলা

লোকমুখে প্রচলিত জামিনী সাধক নামের এক ব্যক্তি ঘোড়ায় করে এসে নববর্ষের এই দিনে সবাইকে প্রসাদ দিতেন এবং তিনি মারা যাওয়ার পর তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ বানানো হয় সেস্থানে। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে স্মৃতিস্তম্ভে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা একটি করে মাটির ঘোড়া রাখে এবং মেলার আয়োজন করে।

এ কারণে লোকমুখে প্রচলিত মেলাটির নাম ঘোড়ামেলা। মেলার অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে নৌকায় খিচুড়ি রান্না করে রাখা হয় এবং আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই কলাপাতায় আনন্দের সঙ্গে তা ভোজন করে। সকাল থেকেই এ স্থানে লোকজনের আগমন ঘটতে থাকে। এক দিনের এ মেলাটি জমে ওঠে দুপুরের পর থেকে। হাজারো লোকের সমাগম ঘটে।

যদিও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কারণে এ মেলার আয়োজন করা হয়। তারপরও সব ধর্মের লোকজনেরই প্রাধান্য থাকে এ মেলায়। এ মেলায় শিশু-কিশোরদের ভিড় বেশি থাকে। মেলায় নাগরদোলা, পুতুল নাচ ও সার্কাসের আয়োজন করা হয়। নানারকম আনন্দ-উৎসব করে পশ্চিমের আকাশ যখন রক্তিম আলোয় সজ্জিত উৎসবে, যখন লোকজন অনেকটাই ক্লান্ত, তখনই এ মেলার ক্লান্তি দূর করার জন্য নতুন মাত্রায় যোগ হয় কীর্তন। এ কীর্তন হয় মধ্যরাত পর্যন্ত।

পার্বত্য জেলায়, আদিবাসীদের বর্ষবরণ

বাংলা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) প্রধান তিনটি ক্ষুদ্রজাতিস্বত্তার প্রত্যেকেরই বছরের নতুন দিনে উৎসব আছে। ত্রিপুরাদের বৈশুখ, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু উৎসব। বর্তমানে তিনটি জাতিস্বত্ত্বা একত্রে এই উৎসবটি পালন করে। যৌথ এই উৎসবের নাম বৈসাবি।

বৈসাবি হলো পাহাড়ীদের সবচেয়ে বড় উৎসব। এ উৎসবকে চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই এবং ত্রিপুরারা বৈসুক, এই নামগুলির আদ্যক্ষর নিয়ে বৈসাবি শব্দের উৎপত্তি। বছরের শেষ দুদিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন এ তিনদিন মিলেই মূলত বর্ষবরণ উৎসব পালিত হয়।

পুরানো বছরের বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণ উপলক্ষে পাহাড়ীরা তিনদিন ব্যাপী এ বর্ষবরণ উৎসব সেই আদিকাল থেকে পালন করে আসছে। এ উৎসব উপলক্ষে পাহাড়ীদের বিভিন্ন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আদিবাসী মেলার আয়োজন করা হয়।

নববর্ষের দিন মারমা উপজাতীয়রা আয়োজন করে ঐতিহ্যবাহী ওয়াটার ফেস্টিবল বা পানি খেলা। পানিকে পবিত্রতার প্রতীক ধরে নিয়ে মারমারা তরুণ-তরুণীদের পানি ছিটিয়ে পবিত্র ও শুদ্ধ করে নেয়। পাহাড়ীদের মধ্যে পানি খেলা উৎসবটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

পশ্চিমবঙ্গে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মহাসমারোহে সাড়ম্বরে উদযাপিত হয় পয়লা বৈশাখ (pohela boishakh)। সমগ্র পশ্চিম বাংলায় বঙ্গাব্দের প্রথম দিনটিতে বিপুল উৎসাহ এবং উদ্দীপনার সাথে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়ে থাকে। বাংলার গ্রামীণ এবং নাগরিক জীবনের মেলবন্ধন সাধিত হয়ে সকলে একসূত্রে বাঁধা পড়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আনন্দে। সারা চৈত্র মাস জুড়েই চলতে থাকে বর্ষবরণের প্রস্তুতি।

চৈত্র মাসের শেষ দিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তি বা মহাবিষুবসংক্রান্তির দিন পালিত হয় চড়কপূজা অর্থাৎ শিবের উপাসনা। এইদিনেই সূর্য মীন রাশি ত্যাগ করে মেষ রাশিতে প্রবেশ করে। এদিন গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে আয়োজিত হয় চড়ক মেলা। মেলায় অংশগ্রহণকারীগণ বিভিন্ন শারীরিক কসরৎ প্রদর্শন করে মানুষের মনোরঞ্জন করে থাকে।

এছাড়া বহু পরিবারে বর্ষশেষের দিন টক এবং তিতা ব্যঞ্জন ভক্ষণ করে সম্পর্কের সকল তিক্ততা ও অম্লতা বর্জন করার প্রতীকী প্রথা একবিংশ শতাব্দীতেও বিদ্যমান। পরের দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ প্রতিটি পরিবারে স্নান সেরে বয়ঃজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করার রীতি বহুল প্রচলিত। বাড়িতে বাড়িতে এবং সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চলে মিষ্টান্ন ভোজন।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির অধিকাংশই এদিন থেকে তাদের ব্যবসায়িক হিসেবের নতুন খাতার উদ্বোধন করে, যার পোশাকি নাম হালখাতা। গ্রামাঞ্চলে এবং কলকাতা শহরের উপকণ্ঠে পয়লা বৈশাখ (pohela boishakh) থেকে আরম্ভ হয় বৈশাখী মেলা। এই মেলা সমগ্র বৈশাখ মাস জুড়ে অনুষ্ঠিত হয়।

একটি জাতি যখন তার নিজ সংস্কৃতিতে আঁকড়ে ধরে বলিষ্ট হয় তখন তাকে কোনো অপসংস্কৃতি, কু-সংস্কার গ্রাস করতে পারেনা। যে কোন জাতির কাছেই তার নিজ সংস্কৃতিই সেরা এবং আপন। বিশ্বায়নের এই যুগে নিজেদের সংস্কৃতির রক্ষায় এবং বিস্তারে আমাদের নিজেদের সংস্কৃতির ছায়াতলে অবস্থান নিতে হবে।

তাই নিজ সংস্কৃতির সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসা শিল্পগুলোর নিয়মিত চর্চার প্রয়োজন। অন্যান্য সংস্কৃতির সাথেও আমরা পরিচিত হব, তবে তার আড়ালে যেন হারিয়ে না যায় আমাদের স্বকীয়তা।

বাঙালি হিসেবে নিজ সংস্কৃতির প্রতি আমাদের আছে দায়বদ্ধতা। পহেলা বৈশাখের গুরুত্ব আমাদের প্রতিনিয়ত আলোর পথ দেখাতে সাহায্য করে। আমাদের সংস্কৃতিই হোক আমাদের শেষ আশ্রয়।

Leave a Reply